মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ফিরহাদ হাকিম
রাজ্যের সামগ্রিক রাজনীতিতে ঐতিহাসিক পালাবদল। কয়েকদিন ধরে চলা তীব্র টালমাটাল পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কলকাতার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতা ফিরহাদ হাকিম। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যেদিন তিনি মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করলেন, ঠিক সেই দিনই কার্যত দু’ভাগ হয়ে গেল রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অন্দরের তীব্র ফাটল ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে তছনছ হয়ে গেল ঘাসফুল শিবির।
দলীয় সূত্রে খবর, ববি হাকিম নিজেই মেয়রের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের কাছে। অনুমতি চেয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী তথা দলীয় নেত্রী তাঁর সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে ইস্তফা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।
বৈঠক শেষে তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানান যে, এই বৈঠকে ববি হাকিমের ইস্তফার বিষয়টি গৃহীত (Accepted) হয়েছে। ববি হাকিমের এই আকস্মিক ইস্তফার পর কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক দায়িত্ব কে সামলাবেন, তা নিয়েও সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে। জানা গেছে, নতুন কোনো মেয়রের নাম ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত এখন থেকে সম্পূর্ণ পুরসভা যৌথভাবে পরিচালনা করবেন পুর কমিশনার (Municipal Commissioner)।
গত বেশ কিছুদিন ধরেই রাজ্যের প্রায় সবকটি পুরসভাতেই পরিস্থিতি অত্যন্ত ডামাডোল হয়ে উঠেছিল। একের পর এক পুর বোর্ড ভেঙে পড়ার কারণে পুর প্রশাসন কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। ব্যতিক্রম ছিল না কলকাতা পুরসভাও। কলকাতার মেয়র তথা তৃণমূলের শীর্ষ স্তরের অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বারবার প্রশ্ন উঠছিল। সেই সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ফিরহাদ হাকিমের এই পদত্যাগ দলের ভাঙনকে আরও ত্বরান্বিত করল।
সূত্রের খবর– সরকার বদলের পর কলকাতা পুরসভার কমিশনারের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে ফিরহাদ হাকিমের। মেয়রকে অজ্ঞাত রেখেই একের পর এক অর্ডার বার হতে থাকে কলকাতা পুরসভা থেকে কমিশনারের নির্দেশে। যার মধ্যে অন্যতম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির নোটিশ। এরপরেই বারে বারে ঘরে বাইরে প্রশ্নের মুখে পড়তে থাকেন ববি। মেয়র পদে থেকেও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া তার মানসিক চাপ বাড়াচ্ছিল বলে, ঘনিষ্ঠ মহলে প্রকাশ করেছেন তিনি। সেই চাপের থেকে মুক্তি পেতেই মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন দলনেত্রীর কাছে। বুধবার নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে মিটিং করার পরেই, ববির ইস্তফার ইচ্ছায় দলনেত্রীর সায় মেলে। জানা যাচ্ছে, আগামীকালের মধ্যে কলকাতা পুরসভার চেয়ারপারসন মালা রায়ের কাছে তার পত্র জমা দেবেন ফিরহাদ হাকিম।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদত্যাগ কেবল একটি প্রশাসনিক পদের বিলুপ্তি নয়, বরং তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভাঙনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। ফিরহাদ হাকিমের ইস্তফার সাথে সাথেই দলের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে চলে আসে এবং দল আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়।
দলের এই নজিরবিহীন ভাঙনের ধাক্কায় সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়েছে তৃণমূলের সমস্ত গণসংগঠনগুলির সবকটি পদ। যুব, ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠন থেকে শুরু করে দলের সমস্ত স্তরের কমিটি ও পদাধিকারীদের পদ এখন অস্তিত্বহীন। এই আকস্মিক ও চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ের জেরে রাজ্যের ক্ষমতা অলিন্দে ঘাসফুল শিবিরের ভবিষ্যৎ এখন বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল কীভাবে এক লহমায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল, তা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে গোটা রাজ্য রাজনীতিতে।

